মনের আজব এক অসুখ মুড সুইং


কুষ্টিয়া আপডেট নিউজ, ১৪ জুন, ২০২০।।   

মুড সুইংঃ

মেজাজ হুট করেই বদলে যাওয়া, মন ভালো আর মন খারাপের অলিগলিতে ক্রমাগত ঘুরপাক খাওয়া,এই হাসিমুখ তো পরক্ষণেই রাগ এগুলো মনের একটা অসুখের লক্ষণ। যার নাম মুড সুইং।

✔️মুড সুইং, এই বিষয়টা আজকাল খুব একটা অপরিচিত নয়। অনেকেই জানেন এই ব্যাপারে এবং সচেতনতাও রাখেন। এই মুড সুইং ভারী আজব এক অসুখ।মন ভালো থেকে একটু খারাপ, অনেক বেশি খারাপ, তীব্র হতাশা, আবার খুশি হয়ে যাওয়া- এইসবই ঘটতে পারে অল্প সময়ের ব্যবধানে।

✔️মুড সুইং অধিক মাত্রায় পরিলক্ষিত হয় মেয়েদের মাঝে। বিশেষ করে পরিবর্তিত শারীরিক অবস্থায় তাদের মুড সুইং হয় চোখে পড়ার মত, সেটি ঘটে মাসিক ঋতুচক্রের সময় আর গর্ভাবস্থায়। এসব দিনে শরীরে হরমোনের তারতম্যে একজন নারী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়। আর এই বিপর্যয় তাকে হালকা কিংবা চরম মাত্রার মুড সুইং দিতে পারে। ঋতুচক্রের সময়টা অল্পদিনের হয় বলে এই সময়ের মুড সুইং দ্রুত কেটে যায়। কিন্তু গর্ভকালীন মুড সুইং দীর্ঘমেয়াদী হয় স্বাভাবিকভাবেই, আর খুব প্রবল মাত্রায় ঘটতে পারে। 

✔️তবে ভেবে নেবেন না যে, এই সমস্যা পুরোপুরিই নারীকেন্দ্রিক! ছাড় নেই পুরুষদেরও। মনের আবার নারী-পুরুষ ভেদাভেদ আছে নাকি যে, মনের অসুখ নারীতে আর পুরুষে ভিন্ন হবে! মুড সুইং হতে পারে যেকোনো মানুষেরই, এটি জীবনের খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার।

♦️নারীদের কেন খুব বেশি মুড সুইং হয়?

মেয়েদের হরমোন এর ওঠানামা ছেলেদের থেকে কিছুটা জটিল ধরণের। একে ‘রোলার কোস্টার রাইড’ এর সাথেও তুলনা করা যায়।নারীদের ক্ষেত্রে মুড সুইং এর কারণ ব্যাখা করতে কিছু সাধারণ জিনিস জানা প্রয়োজন।মেয়েদের মুড একটি নিদৃষ্ট প্যাটার্ন এ চেইঞ্জ হয়।মেয়েদের পিরিয়ড সাইকেল এ হরমোনাল চেইঞ্জ গুলো আসলে এ সময়ে মুড চেইঞ্জ এর জন্য দায়ী।গর্ভবতী মায়েরও সময় অনুযায়ী হরমোন এর প্রভাবে মুড সুইং হয়ে থাকে।

মেয়েদের Monthly Cycle সম্পর্কে কিছুটা হলেও আমরা সবাই জানি। এই সাইকেলের জন্য দায়ী প্রধান দুটি হরমোন হচ্ছে Estrogen এবং Progesterone। পিরিয়ডকালীন মুড সুইং এই দুটি হরমোনের প্রভাবে হয় যাকে আমরা ৪ ভাগে ভাগ করতে পারিঃ

✔️প্রথম সপ্তাহ ( বসন্ত)--

এই সপ্তাহে Estrogen এর মাত্রা বাড়তে থাকে। তাই মেয়েরা এই সময় আশাবাদী এবং উদ্যমী থাকে। আগের সপ্তাহের বিভীষিকা ভুলে দেহের সাথে মন ও নতুন করে উদ্যম সঞ্চয় করে।

✔️দ্বিতীয় সপ্তাহ ( গ্রীষ্ম)--

Estrogen সর্বোচ্চ থাকে এই সপ্তাহে। ফলাফলঃ স্বর্গীয় সৌন্দর্য, অবারিত উদ্যম, আর অনেক অনেক পজিটিভিটি এবং কনফিডেন্স থাকে মেয়েদের ভিতর। এই সপ্তাহটা মেয়েদের জন্য সবথেকে আনন্দের।

✔️তৃতীয় সপ্তাহ ( শরৎ)--

এই সপ্তাহে Estrogen এর মাত্রা কমতে থাকে। তাই সবকিছুই একটু নিচের দিকে যেতে থাকে। ( উদ্যম, সৌন্দর্য এবং যাবতীয় পজেটিভ গুনাবলি) এই সপ্তাহে মেয়েদের মধ্যে সন্দেহ আর হীনমন্যতা দেখা যায় কিছুটা। এমনকি তারা এই সময়ে কিছুটা ইনসিকিউরড ফিল করে। কিছুটা খিটখিটে, খামখেয়ালি, মনমরা আচরণ করতে পারে।

✔️চতুর্থ সপ্তাহ ( শীত)--

এই সপ্তাহে ভয়াবহ মুড সুইং হয়।Estrogen and Progesterone মোটামুটি পাগলের মত দিক-বেদিক ছোটাছুটি করে।রাগ, কান্না, খিটখিট মেজাজ, হতাশা, ব্যথা- সবই হয় বাঁধনছাড়া।এই সময় সব কিছুই অসহ্য লাগে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন অনেক মেয়ের মধ্যে আত্নহত্যার ভাবনাও আসে!

এখানে প্রথম সপ্তাহ শুরু হয় Menstrual cycle শেষ হওয়ার পরদিন থেকে। এখানে সপ্তাহের হিসাবে একজন মেয়ের সাথে অন্যজন মেয়ের পার্থক্য হতে পারে। মোটামুটি ৫ থেকে ৭ দিন ধরে নেওয়া যায়।

♦️হবু মায়ের মুড সুইংঃ

ঋতুচক্রের সময়টা অল্পদিনের হয় বলে এই সময়ের মুড সুইং দ্রুত কেটে যায়। কিন্তু গর্ভকালীন মুড সুইং দীর্ঘমেয়াদী হয় স্বাভাবিকভাবেই, আর খুব প্রবল মাত্রায় ঘটতে পারে। তাই বাড়তি সচেতনতা প্রয়োজন এই সময়টায়। সন্তান জন্মদানের পরেও মানসিক অশান্তির রেশ থেকে যেতে পারে আর সেটা মা ও বাচ্চা দুইজনের জন্যই বেশ ভয়াবহ।প্রথম তিন মাসের সাইকেলে অর্থাৎ প্রথম ট্রিমেস্টারে বেশি মুড সুইং দেখা দেয় একজন হবু মায়ের, যা আবার ঘটে শেষ তিন মাসের সাইকেলে অর্থাৎ তৃতীয় ট্রিমেস্টারে।

♦️মুড সুইং এ কি কি লক্ষন প্রকাশ পায়ঃ

# খিটখিটে ভাব
# রাগ
# মেজাজ
# কান্না
# অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা
# উদ্বিগ্ন ভাব
# পর্যায়ক্রমিক বিষাদ ও রাগ

♦️কখন সাবধান হবেন?

শারীরিকভাবে হরমোনাল কারণে মুড সুইং অল্প হতে পারে।কিন্ত অতিরিক্ত মুড সুইং মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। এজন্য কিছু দিক খেয়াল রাখা দরকার-

• নিজের ক্ষতিসাধন করতে চাচ্ছেন, জীবন শেষ করে দেয়ার চিন্তাও আসছে কখনো কখনো।
• বন্ধুবান্ধব, আপনজনদের এড়িয়ে যাচ্ছেন, কাজ করতে এমনকি চলাফেরা করতেও অনীহা হচ্ছে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে।
• মানুষের মুখোমুখি হতে চাচ্ছেন না, কোনো অপ্রীতিকর আচরণে লিপ্ত হচ্ছেন।

এসব লক্ষণ আবিষ্কার করলে একটু সামলে চলুন, হয়তো আপনার কাউন্সিলিং প্রয়োজন!

♦️যেভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেন মুড সুইংঃ

• সময়সূচী মেনে চলার অভ্যাস করুন
• ব্যায়াম একটি ভালো উপায় মানসিক চাপ কমানোর
• পর্যাপ্ত ঘুম অত্যাবশ্যক
• খাদ্য তালিকা হোক সুষম
• যোগ ব্যায়ামে আসবে মনের প্রশান্তি
• মানসিক পীড়া পাশ কাটান যতটা সম্ভব
• গুটিয়ে না থেকে নিজেকে প্রকাশ করতে শিখুন।
• একজন অন্তত মানুষ আপনার থাকা চাই, হোক সে বন্ধু বা পরিবারের কেউ, কিংবা জীবনের বিশেষ সেই মানুষটি যার কাছে মন একদম মেলে ধরতে পারবেন।

♦️মুড সুইং আসলে এমন একটা জিনিস যে আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। যার অন্যতম কারন অজ্ঞতা। অনেক সময় দেখা যায় ভিক্টিম নিজেও তার মুড সুইং সম্পর্কে অবহিত না।কিন্ত সবাইকে মুড সুইং এর ব্যাপারে জানা প্রয়োজন।বাংলাদেশ এর মতো উন্নয়নশীল দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামায় না,কিন্ত এরকম ঘটনা অনেক পাওয়া যাবে যে আত্মহত্যা করেছে অনেকে কারও এতটু সহানুভূতি না পেয়ে।তাই নিজে জানুন অন্যকে জানান এবং মুড সুইং এর সময় আপনার আপনজনকে সাহস দিন।খুব বেশি পরিমানে দেখা দিলে সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং নিন।শরীরের রোগের পাশাপাশি মনের দিকটাও খেয়ালে আসুক মানুষের। মন তো ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ, ভালো-মন্দ মনেরও থাকে, অসুখ তারও হয়, বরং শরীরের চেয়েও নাজুক রকম অসুখ হতে পারে আমাদের মনের। তাই খানিক যত্ন করি না কেন আমরা নিজেদের মনের, ক্ষতি তো নেই!

ভালো থাকুক আপনার মুড
মিন্ডো, ফিল গুড 👍

Post a Comment

Previous Post Next Post